বাংলা (অষ্টম শ্রেণী)

 


১. 'ভয় দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ' - কোন ভূতের সর্বনাশ করবে ?

শিকল-পরার গান' কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যে "ভয় দেখানো ভূতের" সর্বনাশ করার কথা বলেছেন, তা হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সৃষ্টি করা ভয় এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল (শিকল)।

​ব্রিটিশ শাসকরা অত্যাচার-নির্যাতনের মাধ্যমে ভারতবাসীর মনে এক গভীর ভীতির সঞ্চার করেছিল, যাতে কেউ স্বাধীনতার পথে পা না বাড়ায়। এই ভীতিই হলো কবি বর্ণিত 'ভূত'। কবি ও তাঁর অনুগামী বিপ্লবীরা স্বেচ্ছায় কারাবরণ ও শিকল পরিধানের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে তাঁরা আর এই ভয়কে মানবেন না। এই শৃঙ্খলকে তাঁরা পরাধীনতার প্রতীক মনে না করে, মুক্তির অগ্রদূতের ভূষণ মনে করেছেন। এই নির্ভীক আচরণের মাধ্যমে তাঁরা ব্রিটিশদের দেখানো ভয়ের পরিবেশটির অর্থাৎ 'ভূতের' সর্বনাশ করতে চেয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষও এই ভয় ঝেড়ে ফেলে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।



২. শিকল পরার গান কবিতার নাম কেন এরকম হলো?

কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'শিকল-পরার গান' শিরোনামটি এক গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী এবং সম্পূর্ণ সার্থক নামকরণ। কবিতার প্রথম পঙক্তিতেই কবি যে ঘোষণা করেছেন, "এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল," তাতেই নামকরণের মূল তাৎপর্য নিহিত। এখানে 'শিকল' পরাধীনতার প্রতীক হলেও, কবি একে 'ছল' বা কৌশল বলেছেন, যার মাধ্যমে রাজবন্দীরা স্বেচ্ছায় কারাবরণ করে ইংরেজদের দেওয়া বন্দিত্বের ভয়কে উপহাস করছেন। এই আপাত-শিকল পরা আসলে বন্দিত্বের স্বীকৃতি নয়, বরং ইংরেজদের দেওয়া বন্ধনকে বিকল করে দেওয়ার এবং দেশের মানুষের মন থেকে বাঁধন-ভয় দূর করার একটি সুচিন্তিত কৌশল। এই বিদ্রোহের মূল সুরটিই নামকরণের মধ্যে ধরা পড়েছে।

এছাড়াও, নামের শেষাংশে ব্যবহৃত 'গান' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুক্তি-পথের যাত্রীদের হতাশার ক্রন্দন নয়, বরং আনন্দ ও নির্ভীকতার বহিঃপ্রকাশ। কবি এই শিকলের ঝনঝনানিকে ক্রন্দন না বলে, 'মুক্তি-পথের অগ্রদূতের চরণ-বন্দনা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই বন্দনার সুর বা উল্লাসই 'গান' শব্দের মাধ্যমে ধ্বনিত হয়েছে। প্রতীকী অর্থে, 'শিকল' শব্দটি ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার ও পরাধীনতার প্রতীক, আর 'গান' শব্দটি এই অত্যাচারকে জয় করার বিদ্রোহী মানসিকতা, প্রাণশক্তি ও আশার প্রতীক। এই দুই বিপরীতধর্মী প্রতীকের সফল সমন্বয়ে নামকরণটি এক গভীর তাৎপর্য লাভ করেছে। সর্বোপরি, এই কবিতার মূল উদ্দেশ্য ছিল পরাধীনতার শিকলকে হাসিমুখে বরণ করে দেশবাসীর মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালানো, এবং সেই মূল বক্তব্যটিই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থে নামকরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এই কারণেই বলা যায়, 'শিকল-পরার গান' নামটি কবিতার বিষয়বস্তু, মূলভাব এবং বিদ্রোহী চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে এটি একটি যথার্থ ও সার্থক নামকরণ।

৩. "মোদের অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল "- কিভাবে, কাদের অস্থি দিয়ে দেশে আবার বজ্রানল জ্বলে উঠবে ?

কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী কবিতা 'শিকল-পরার গান' থেকে নেওয়া আলোচ্য পঙক্তিটি পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী বন্দি ও বিপ্লবীদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং দৃঢ় সংকল্পকে মহিমান্বিত করেছে। এখানে 'মোদের' বলতে কবি সেইসব দেশপ্রেমিক সৈনিক, রাজবন্দি, এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী যুবসমাজকে বুঝিয়েছেন, যারা ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার, জেল-জুলুম ও লাঞ্ছনাকে মাথা পেতে নিয়েছেন। কবি এই বীরদের কারাবাসকে কোনো পরাজয় হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল বলে বর্ণনা করেছেন। পঙক্তিটির মূল অর্থ হলো—এই লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত দেশপ্রেমিকেরা তাঁদের সমস্ত দুঃখ-যন্ত্রণা ও হাসিমুখে বরণ করা মৃত্যুকে পুঁজি করে দেশের পরাধীনতার অন্ধকার দূর করবেন। তাঁদের এই সর্বস্ব বা 'অস্থি' দিয়েই দেশে আবার 'বজ্রানল' অর্থাৎ বিপ্লবের আগুন বা স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জ্বলে উঠবে। এই বজ্রানল অত্যাচারী শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দেবে এবং দেশে নবজাগরণ ও চূড়ান্ত মুক্তি নিশ্চিত করবে। সুতরাং, এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে মুক্তিকামী মানুষের চরম আত্মত্যাগ ও বলিদানই পরাধীন দেশে স্বাধীনতার বিপ্লবী চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করবে এবং শেষ পর্যন্ত তা দেশকে শত্রু মুক্ত করবে।

আরও প্রশ্নোত্তর শীঘ্রই আপলোড করা হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post