মাধ্যমিক ভূগোল (৫ নম্বর)

 1. ভারতের কৃষিকাজের উপর মৌসুমী বৃষ্টিপাতের প্রভাব আলোচনা কর।

ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ, যার অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রায় ৫০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল। ভারতের কৃষির এই সামগ্রিক চিত্রটি সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি জলবায়ুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমন কালের উপর নির্ভর করে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সময় নির্ধারিত হয়, যা ফসল উৎপাদনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

ভারতের কৃষির উপর মৌসুমি বায়ুর প্রভাব নিম্নরূপ:

১. বর্ষাকালের খারিফ ফসল (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু)

প্রধান চালিকাশক্তি: গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটে। এই বৃষ্টিপাতই গ্রীষ্মকালীন খারিফ ফসল চাষের মূল ভিত্তি।

প্রধান ফসল: এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ খারিফ ফসলগুলির মধ্যে রয়েছে— ধান, জোয়ার, বাজরা, রাগি, ভুট্টা, বাদাম এবং ইক্ষু (আখ) প্রভৃতি।

২. জায়িদ ফসল উৎপাদন

গ্রীষ্মকালীন উৎপাদন: মার্চ-এপ্রিল মাসের শুরুতে কিছু দ্রুত বর্ধনশীল খাদ্যশস্যের চাষ করা হয় এবং বর্ষার আগমনের আগেই সেগুলিকে তুলে নেওয়া হয়। পটল, ঝিঙে, শশা ইত্যাদি এই জায়িদ ফসল-এর অন্তর্ভুক্ত।

৩. বৃষ্টিপাতের তারতম্যে ফসলের বৈচিত্র্য

অধিক বৃষ্টিপাত: যে অঞ্চলগুলিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি (যেমন আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ), সেখানে সাধারণত ধান, চা, এবং কফির মতো ফসলের চাষ হয়।

মাঝারি বৃষ্টিপাত: যেখানে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে ইক্ষু, গম এবং তুলার মতো ফসল ভালো জন্মায়।

৪. শীতকালের রবি ফসল (উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝা)

শীতকালীন বৃষ্টিপাত: শীতকালে ভারতে সাধারণত বৃষ্টিপাত কম হয়। তবে, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা-এর প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারত ও গাঙ্গেয় উপত্যকায় যে স্বল্প বৃষ্টিপাত হয়, তার ওপর নির্ভর করেই শীতকালীন রবিশস্যের চাষ হয়।

প্রধান ফসল: এই রবিশস্যগুলির মধ্যে গম, যব, সরষে, ছোলা, আলু, এবং তিসি অন্যতম।

৫. প্রধান খাদ্যশস্যের উপর প্রভাব

ভারতের প্রধান দুটি খাদ্যশস্য — ধান ও গম — এর উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল:

ধান: ধান চাষের জন্য বেশি বৃষ্টিপাত (100 সেমি-200 সেমি) প্রয়োজন, যা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর দ্বারা নিশ্চিত হয়।

গম: গম চাষের জন্য মাঝারি বৃষ্টিপাত (50 সেমি-100 সেমি) প্রয়োজন, যা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ও উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর সহায়তায় হয়।

যে বছর মৌসুমি বায়ু সময়মতো আগমন করে এবং সঠিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটায়, সে বছর খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতটি ঘটলে (সময়মতো না আসা বা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত) কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই কারণেই বলা হয়, 'ভারতের কৃষিকার্য মৌসুমি বায়ু দ্বা

রা নিয়ন্ত্রিত'।

2. সুন্দরবনের ওপর বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব আলোচনা কর।

সুন্দরবন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং এক অনন্য বাস্তুতন্ত্রের ধারক, বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আজ এক মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন। এই পরিবর্তনগুলি সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান প্রভাবগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি

প্রভাব: বিগত বছরগুলিতে সুন্দরবন সংলগ্ন নদী ও সমুদ্রজলের উষ্ণতা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন, ১৯৮০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রতি দশকে প্রায় 0.5°C হারে উষ্ণতা বেড়েছে)।

ফলাফল: উষ্ণতার এই বৃদ্ধি ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বাস্তুতন্ত্রের উপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, যা এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে।

২. ঘূর্ণিঝড় ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন

ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের সংখ্যা এবং তাদের ধ্বংসাত্মক তীব্রতা ক্রমশই বাড়ছে। 'আয়লা'-এর মতো প্রবল ঘূর্ণিঝড়গুলি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ঝড়গুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।

অনিয়মিত বৃষ্টিপাত: মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা কৃষি এবং অন্যান্য পরিবেশগত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।

৩. সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি

ভূমি নিমজ্জন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি সুন্দরবন অঞ্চলের জন্য এক বৃহত্তম বিপদ। সমুদ্রের জল দ্রুত বাড়তে থাকায় এখানকার বহু দ্বীপ, যেমন লোচাচরা এবং নিউমুর, ইতিমধ্যেই জলের নিচে তলিয়ে গেছে।

উপকূলীয় ভাঙন: এর ফলে উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন ও ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪. জল ও মাটির লবণতা বৃদ্ধি

লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্র জলতল বেড়ে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের নদী, খাল এবং বিশেষ করে মাটির লবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি ও পানীয় জলের সংকট: লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জলের অভাব দেখা দিচ্ছে। একই সাথে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

৫. বন্যার আশঙ্কা বৃদ্ধি

নদী বাঁধের দুর্বলতা: সমুদ্রের জল এবং নদীর জলতল বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার দুর্বল নদী বাঁধগুলি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলস্বরূপ প্রায়শই ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি হচ্ছে।

3.পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়ের সঙ্গে নিয়ত বায়ু প্রবাহের সম্পর্ক আলোচনা কর।

পৃথিবীর বিভিন্ন বায়ুচাপ বলয়-এর মধ্যে চাপের তারতম্যের কারণেই নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। বায়ু সবসময় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয়-এর দিকে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে সৃষ্ট কোরিওলিস বল-এর প্রভাবে এই বায়ুপ্রবাহ ফেরেলের সূত্র মেনে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়। প্রধানত তিনটি নিয়ত বায়ুপ্রবাহ লক্ষ্য করা যায়— আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু এবং মেরু বায়ু।

প্রধান নিয়ত বায়ুপ্রবাহ এবং বায়ুচাপ বলয়ের সম্পর্ক

১. আয়ন বায়ু (Trade Winds)

সম্পর্ক: উভয় গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (কর্কটীয় 30° উত্তর এবং মকরীয় 30° দক্ষিণ) থেকে বাতাস নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (0° থেকে 5° উভয় দিকে) এর দিকে নিয়মিত প্রবাহিত হয়।

উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু: উত্তর গোলার্ধে বাতাস ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু: দক্ষিণ গোলার্ধে বাতাস বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

২. পশ্চিমা বায়ু (Westerlies)

সম্পর্ক: উভয় গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (30° থেকে 35° উভয় দিকে) থেকে বাতাস মেরুবৃত্তপ্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (60° থেকে 65° উভয় দিকে) এর দিকে নিয়মিত প্রবাহিত হয়।

দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু: উত্তর গোলার্ধে বাতাস ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু: দক্ষিণ গোলার্ধে বাতাস বামদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

এই বায়ুপ্রবাহ 40° থেকে 50° দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়, যা 'গর্জনশীল চল্লিশ', 'ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ' এবং 'চিৎকারকারী ষাঠ' নামে পরিচিত।

৩. মেরু বায়ু (Polar Winds)

সম্পর্ক: উভয় গোলার্ধের মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় (80° থেকে 90°) থেকে শীতল বাতাস মেরুবৃত্তপ্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (60° থেকে 65°) এর দিকে নিয়মিত প্রবাহিত হয়।

উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু: উত্তর গোলার্ধে বাতাস ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু: দক্ষিণ গোলার্ধে বাতাস বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।

সংক্ষেপে, পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলিই মূলত নিয়ত বায়ুপ্রবাহের উৎস ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে, আর পৃথিবীর আবর্তন সেই পথে দিক পরিবর্তন ঘটায়।

4.ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের অবস্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো।

এখানে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর অবস্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে ও সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর অবস্থান

এই জলবায়ু অঞ্চলটি প্রধানত উভয় গোলার্ধে 10°C থেকে 25°C অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে মহাদেশগুলির পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশে দেখা যায়।

এটি মূলত ঋতু অনুসারে বিপরীতমুখী মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত।

প্রধান অবস্থান ক্ষেত্র:

 * এশিয়া: ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (যেমন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম), এবং চীনের কিছু অংশ।

 * অন্যান্য অঞ্চল: উত্তর অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ, পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার অংশবিশেষ এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ। 

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য

মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনশীলতা এবং খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত।

১. ঋতু পরিবর্তন: সুস্পষ্ট চারটি ঋতু

এই জলবায়ুতে উষ্ণতার হ্রাস-বৃদ্ধি ও মৌসুমি বায়ুর আগমন-প্রত্যাবর্তন অনুসারে চারটি প্রধান ঋতু পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়:

 * উষ্ণ আর্দ্র গ্রীষ্মকাল: (মার্চ - জুন) দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের পূর্বের সময়, সর্বোচ্চ উষ্ণতা বিরাজ করে।

 * আর্দ্র বর্ষাকাল: (জুলাই - সেপ্টেম্বর) উষ্ণ ও আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

 * স্বল্পস্থায়ী শরৎকাল: (অক্টোবর - নভেম্বর) মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনের সময়, প্রায়শই ঘূর্ণিঝড় দেখা যায়।

 * শীতল ও শুষ্ক শীতকাল: (ডিসেম্বর - ফেব্রুয়ারি) শীতল ও শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাব থাকে, বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না।

২. উষ্ণতা-সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য:

 * সারাবছর উচ্চ উষ্ণতা: বার্ষিক গড় উষ্ণতা সাধারণত বেশি থাকে।

 * গ্রীষ্মে চরম উষ্ণতা: গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল-মে) তাপমাত্রা 38°C থেকে 48°C পর্যন্ত হতে পারে।

 * বার্ষিক ও দৈনিক উষ্ণতার প্রসর: সমুদ্র থেকে দূরত্ব বাড়লে উষ্ণতার বার্ষিক ও দৈনিক প্রসর (সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য) বৃদ্ধি পায়।

৩. বায়ুপ্রবাহ সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য:

 * মৌসুমি বায়ুর প্রাধান্য: গ্রীষ্মে সমুদ্র থেকে আসা আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং শীতে স্থলভাগ থেকে আসা শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু এই অঞ্চলের আবহাওয়াকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করে।

 * বায়ুচাপের পরিবর্তন: সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্ম ও শীতকালে বায়ুচাপ কেন্দ্রের (উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ) অবস্থান পরিবর্তিত হয়।

 * ঘূর্ণিঝড়: শরৎকাল বা প্রত্যাবর্তনের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মের প্রাক্কালে স্থানীয়ভাবে কালবৈশাখী-এর মতো ঝড় সৃষ্টি হয়।

৪. বৃষ্টিপাত সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য:

 * বর্ষাকালে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত: বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় 80\% বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঘটে।

 * বৃষ্টিপাতের প্রকৃতি: প্রধানত শৈলোৎক্ষেপ ও ঘূর্ণবাতজনিত বৃষ্টিপাত দেখা যায়।

 * বৃষ্টিপাতের খামখেয়ালিপনা: মৌসুমি বায়ুর অনিশ্চয়তার কারণে কোনো বছর অতিবৃষ্টিতে বন্যা আবার কোনো বছর অনাবৃষ্টিতে খরা দেখা যায়।

 * বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টন: ভূপ্রকৃতি ও সমুদ্র থেকে দূরত্বের তারতম্যের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থানভেদে ভিন্ন হয়।

 * বৃষ্টিহীন শীতকাল: উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু শুষ্ক হওয়ায় শীতকাল সাধারণত বৃষ্টিহীন থাকে।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে মূলত উষ্ণতা ও আর্দ্রতার ভিত্তিতে বছরকে ভাগ করা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হলো এই জলবায়ুর প্রাণ, যা এই অঞ্চলকে বিপুল পরিমাণে জলসম্পদ প্রদান করে, কিন্তু এর খামখেয়ালিপনার জন্য জীবনযাত্রায় বন্যা-খরা জনিত সমস্যাও সৃষ্টি হয়।

5.হিমরেখার উচ্চতা কি কি বিষয়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় ?
 

পর্বতের গায়ে বা ভূপৃষ্ঠে যে উচ্চতার ওপর সারাবছর তুষার জমে থাকে বা যে উচ্চতার নীচে তুষার গলে জল হয়ে যায়, উচ্চতার সেই সীমারেখার নাম হিমরেখা। এই হিমরেখার উচ্চতা নির্ভর করে —

1. অক্ষাংশ : উচ্চ অক্ষাংশের তুলনায় নিম্ন অক্ষাংশে উষ্ণতা বেশি তাই হিমরেখার উচ্চতাও উচ্চ অক্ষাংশে কম এবং নিম্ন অক্ষাংশে বেশি। উদাহরণ: মেরু অঞলে হিমরেখার অবস্থান প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠ (0 মিটার) থেকে শুরু করে নাতিশীতােষ্ণ অঞলে 2000-2500 মিটার, ক্রান্তীয় অঞ্চলে 4000-4500 মিটার এবং নিরক্ষীয় অঞলে প্রায় 5500 মিটার উচ্চতায় অবস্থান করে। 

2. ভূমির ঢাল : নিরক্ষরেখার বিপরীত দিকে ঢালু ভূমির তুলনায় সূর্যরশ্মি বেশি পড়ে বলে নিরক্ষরেখার দিকে ঢালু ভূমি বেশি উত্তপ্ত হয় এবং এজন্য হিমরেখার উচ্চতাও বেশি হয়। উদাহরণ: হিমালয়ের উত্তর ঢালের তুলনায় দক্ষিণ ঢালে অর্থাৎ নিরক্ষরেখামুখী ঢালে হিমরেখার উচ্চতা 1000 মিটারেরও বেশি হয়। 

3. ঋতুবৈচিত্র্য : ঋতু অনুসারে হিমরেখার অবস্থানে পার্থক্য হয়। গ্রীষ্মকালে হিমরেখা ওপরে উঠে যায়, আবার শীতকালে নেমে আসে। উদাহরণ: শীতকালে হিমালয়ের কোনাে কোনাে অংশে হিমরেখা প্রায় 3700 মিটার পর্যন্ত নেমে এলেও গ্রীষ্মকালে তা প্রায় 4800 মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে যায়। এজন্য হিমালয়ের হিমরেখার উচ্চতা 4800 মিটার ধরা হয়। 

4. বায়ুপ্রবাহ : যেসব স্থানে উয় বায়ু প্রবাহিত হয় সেখানে হিমরেখার উচ্চতা বেশি হয়। আবার, পর্বতের একদিকে উষ্ণ বায়ু এবং অন্যদিকে শীতল বায়ু প্রবাহিত হলে উভয় দিকের মধ্যে হিমরেখার উচ্চতাতেও পার্থক্য হয়। উদাহরণ: রকি পর্বতের পূর্ব ঢালে উঃ চিনুক বায়ুর প্রভাবে হিমরেখার উচ্চতা পশ্চিম ঢালের তুলনায় বেশি।

6. উপগ্রহ চিত্র সংগ্রহের পর্যায়গুলি আলোচনা করো।

উপগ্রহের মাধ্যমে কোনো অঞ্চলের ছবি বা তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াক্রম অনুসরণ করা হয়। এই পর্যায়গুলি  হলো:

​১. শক্তির উৎস (Energy Source)

​দূর সংবেদনের জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি শক্তির উৎস, যা সাধারণত সূর্য। এই উৎস থেকে তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি (EMR) নির্গত হয় এবং লক্ষ্যবস্তুকে আলোকিত করে। এটিই তথ্য সংগ্রহের প্রাথমিক ধাপ।

​২. বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে শক্তির মিথস্ক্রিয়া (First Atmospheric Interaction)

​সূর্য থেকে আগত শক্তি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে আসে, তখন বায়ুর কণা দ্বারা তার কিছু অংশ শোষিত (Absorbed) এবং বিচ্ছুরিত (Scattered) হয়। ফলে সেন্সরে পৌঁছানোর আগেই কিছুটা শক্তির হ্রাস ঘটে।

​৩. পার্থিব বস্তুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া (Interaction with Target)

​আলো বা তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি যখন ভূপৃষ্ঠের কোনো বস্তু (যেমন: গাছ, জল, রাস্তা) বা লক্ষ্যবস্তুর ওপর পতিত হয়, তখন বস্তুর প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেই শক্তির কিছু অংশ প্রতিফলিত (Reflected) হয়, কিছু অংশ শোষিত হয় এবং কিছু অংশ সঞ্চারিত হয়। উপগ্রহ চিত্র মূলত প্রতিফলিত শক্তির ওপর নির্ভর করে।

​৪. বিকীর্ণ শক্তির সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের পুনঃমিথস্ক্রিয়া (Second Atmospheric Interaction)

​পার্থিব বস্তু থেকে প্রতিফলিত শক্তি যখন উপগ্রহে থাকা সেন্সরের দিকে যাত্রা করে, তখন দ্বিতীয়বারের জন্য সেটি বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে আসে। এই সময়েও কিছু পরিমাণ শক্তির শোষণ ও বিচ্ছুরণ ঘটে।

​৫. সেন্সর দ্বারা শক্তি সংগ্রহ (Recording by Sensor)

​প্রতিফলিত বা বিকীর্ণ শক্তিটি শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম উপগ্রহে স্থাপিত সংবেদকে বা সেন্সরে (Sensor) এসে পৌঁছায়। বস্তুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতিফলিত শক্তির পরিমাণের পার্থক্য হয়, আর এই পার্থক্যই সেন্সর দ্বারা সংগৃহীত ও লিপিবদ্ধ হয়। সেন্সর এই শক্তিকে সংখ্যা বা 'ডিজিট'-এর আকারে ধরে রাখে।

​৬. তথ্য প্রেরণ ও প্রক্রিয়াকরণ (Transmission and Processing)

​সেন্সরে সংগৃহীত এই সংখ্যা বা ডিজিটগুলি মহাকাশ থেকে ভূমিতে অবস্থিত কেন্দ্রে (Ground Station) প্রেরণ করা হয়। ভূমি কেন্দ্রে থাকা শক্তিশালী কম্পিউটার এবং 'ডিজিটাল ইমেজ প্রসেসিং সিস্টেম'-এর সাহায্যে এই সংখ্যাগুলিকে বিশ্লেষণ করে, প্রক্রিয়াকরণ করে এবং শেষে ব্যবহারযোগ্য চিত্র বা ছবিতে রূপান্তরিত করা হয়।


Post a Comment

Previous Post Next Post