সপ্তম শ্রেণী (বাংলা প্রবন্ধ)

 

পরিবেশ রক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা

ভূমিকা:

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার ছাত্রসমাজের ওপর। তারা শুধু দেশ ও জাতির মেরুদণ্ডই নয়, তারা হল আগামীর দূত। আমাদের চারপাশের মাটি, জল, বাতাস, অরণ্য, পর্বত—এইসব পার্থিব উপাদান নিয়েই গঠিত আমাদের পরিবেশ। মানুষ যখন থেকে এই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে নিজেকে প্রভু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন থেকেই পরিবেশের উপর দূষণের কালো ছায়া পড়েছে। এই দূষণজনিত সমস্যা থেকে পরিবেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজকের ছাত্রছাত্রীদের কাঁধেই বর্তায়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দূষণের প্রভাব

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশ দূষণের মারাত্মক প্রভাব চোখে পড়ার মতো। শহরের আশেপাশে নর্দমার জল, আবর্জনার স্তূপ শুধু দুর্গন্ধই ছড়ায় না, তা ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগের জন্ম দেয়। এছাড়াও, যানবাহন ও কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অসহনীয় শব্দ এক কথায় প্রাণঘাতী। আবার, গ্রামাঞ্চলে পানীয় জলে আর্সেনিকের মতো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি দেখা যায়। পুকুর-ডোবাগুলি প্রায়শই মশামাছির রাজ্যে পরিণত হয় এবং যেখানে-সেখানে মল-মূত্র ত্যাগের ফলে বৃষ্টির জলে মিশে সেই জল আরও দূষিত ও অব্যবহার্য হয়ে ওঠে। পরিবেশের এই দূষণক্লিষ্ট রূপটি আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

পরিবেশ রক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় ভূমিকা

পরিবেশকে সুস্থ ও সুন্দর রাখার জন্য ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি ভূমিকা নিতে পারে:

সচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষা: এখন স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিবেশ শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। ছাত্রছাত্রীরা তাদের এই নতুন জ্ঞান দিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারে। তারা বিভিন্ন সমীক্ষা ও ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের কারণগুলি সম্পর্কে আমজনতাকে অবহিত করতে পারে।

বৃক্ষরোপণ অভিযান: পরিবেশ দূষণ কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল গাছ লাগানো। ছাত্রছাত্রীরা তাদের বাড়ির চারপাশে, স্কুলে এবং আশেপাশে ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেবে। তারা প্রতিবেশীদের "গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান" এই বার্তা দিয়ে উৎসাহিত করবে।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ: তারা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশেপাশে জোরে মাইক বাজানো, শব্দবাজি পোড়ানো বা অপ্রয়োজনে গাড়ির হর্ন বাজানো থেকে অন্যদের বিরত থাকতে বলবে। প্রয়োজনে তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

শহরাঞ্চলে পরিচ্ছন্নতা: শহরের ছাত্রছাত্রীরা আবর্জনা পরিষ্কার করা, জলনিকাশি ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা তা পরিদর্শন করা এবং নর্দমায় মশা-মাছি ধ্বংস করার অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। খোলা হাইড্রেন বা ম্যানহোল বন্ধ করার বিষয়েও তারা নজর রাখতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যবিধি: গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা নিরক্ষর মানুষদের বোঝাতে পারে যে পুকুর-ডোবা পরিষ্কার রাখা, পথঘাট আবর্জনামুক্ত করা এবং যেখানে-সেখানে মল-মূত্র ত্যাগ না করা কতটা জরুরি। তারা হাতে-কলমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে এগিয়ে এসে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।

উপসংহার

ছাত্রছাত্রীরা হলো দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও তরুণ প্রাণশক্তি। অতীতেও তারা সমাজ গঠন ও গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। পরিবেশ রক্ষা কোনো একক মানুষের কাজ নয়, এটি সম্মিলিত দায়িত্ব। আজকের ছাত্রছাত্রীরা যদি পরিবেশ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সচেতনভাবে এই দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সমাজের সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারে, তবে আমাদের দেশ দূষণমুক্ত ও উন্নত পরিবেশের চরম শিখরে পৌঁছাতে পারবে।

একটি ঝড়ের রাতের অভিজ্ঞতা

ভূমিকা

আমাদের জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটে, কিন্তু কিছু ঘটনা মনের গভীরে এমনভাবে দাগ কেটে যায় যে তার ভয়াবহ স্মৃতি সহজে ভোলা যায় না। আমার জীবনে দেখা তেমনই এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হলো একটি ঝড়ের রাত। সেই বিভীষিকাময় রাতের ধ্বংসলীলার কথা মনে পড়লে আজও ভয়ে শিউরে উঠি।

ঝড়ের আগমনী সংকেত

সেটা ছিল ভাদ্র মাসের শেষ দিক। সকাল থেকেই আকাশ ছিল গম্ভীর ও থমথমে। পিঁপড়েরা মুখে ডিম নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছিল, আর পাখিরা দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছিল অন্য কোথাও। সন্ধ্যা নামার আগেই ঘন কালো মেঘে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। গ্রামের পূর্ব দিকে খালি নদীর ওপর কালো থামের মতো জলের স্তম্ভ দেখে বৃদ্ধ দাদু বলেছিলেন, "ইন্দ্রদেবের হাতি শুঁড় দিয়ে জল তুলছে!" পরে দাদা বুঝিয়ে দিলেন ওটা আসলে ঘূর্ণি বায়ুর কারণে তৈরি হওয়া 'জলস্তম্ভ'। এই দৃশ্য দেখে বাবা তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করতে বললেন। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, তাই হ্যারিকেনের আলো ছিল আমাদের ভরসা। চারদিকে ভয়ের একটা চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

সেই ভয়াল রাত

সেদিন ছিল অমাবস্যা, তাই সূর্যাস্তের পর গাঢ় অন্ধকার চারদিক গ্রাস করল। রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করল বাতাসের স্রোত। প্রথমে দূর থেকে ভেসে এল এক বিকট শব্দ, যেন কোনো এরোপ্লেন খুব নিচ দিয়ে উড়ে আসছে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দে মনে হচ্ছিল বৃক্ষরাজি যেন রাগে ফুঁসছে। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। ঝড় আর বৃষ্টির এই ভয়াল তাণ্ডব যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের সৃষ্টি করেছিল। ঝড়ের দাপটে জানলা-দরজার পাল্লা বারবার খুলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাজ পড়ার শব্দে পৃথিবী কেঁপে উঠছিল। ঝড়ের এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখে মনে হচ্ছিল যেন সবকিছু এই ঝড়ের অতলে তলিয়ে যাবে। একসময় ঝড়ের ধাক্কায় নদীর জল ডাঙায় উঠে আসায় উঠোনের নিচে জল জমতে শুরু করল। হঠাৎ দরজায় তীব্র করাঘাত ও কান্নার শব্দ শুনে দরজা খুলতেই তেরো-চৌদ্দজন মানুষ ঘরে ঢুকে পড়ল। তাদের নিজেদের বাড়ি ঝড়ে ভেঙে যাওয়ায় তারা আমাদের উঁচু ও দালান বাড়িতে আশ্রয় নিতে এসেছিল। সকলের চোখেমুখে ছিল চরম আতঙ্কের ছাপ।

ঝড়ের পরের দৃশ্য

ভোর হতেই ঝড়ের বেগ কমে গেল এবং চারদিকে নেমে এল নিস্তব্ধতা—ঠিক যেন যুদ্ধের পরের দৃশ্য। পরিচিত গ্রামকে দেখে অপরিচিত মনে হলো। বড় বড় গাছগুলি শিকড়সমেত উপড়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। বেশিরভাগ বাড়ির চালা উড়ে গেছে বা মাটির দেওয়াল ভেঙে পড়েছে, কুঁড়ে ঘরগুলো তলিয়ে গেছে জলের নিচে। দ্রুত গতিতে বয়ে যাওয়া জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে মৃত পশু, বাড়ির ভাঙা অংশ ও আসবাবপত্র। চারদিকে সর্বস্বান্ত মানুষের বুকফাটা হাহাকার আর ক্রন্দন। প্রকৃতির এমন বিধ্বংসী চেহারা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সরকারি উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছাল।

উপসংহার

প্রকৃতির শান্ত এবং স্নেহময়ী রূপের আড়ালে যে এমন ভয়াল ধ্বংসের ক্ষমতা লুকিয়ে থাকতে পারে, সেদিন রাতে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। ঝড়ের সেই দুর্যোগময় রাত্রির স্মৃতি আজও আমার মন থেকে মুছে যায়নি। সেদিন তরুণদের উদ্ধার কাজ করতে দেখে আমি শপথ নিয়েছিলাম, বড়ো হয়ে আমিও নিজেকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করব।

দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

ভ্রমণ হলো জ্ঞান অর্জনের এক চমৎকার উপায়। বই পড়ে আমরা যা শিখি, দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে তা হাতে-কলমে অনুভব করতে পারি। আমার দেশ ভারতের বিশালতাকে কাছ থেকে জানার এমনই এক দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল সম্প্রতি আমার কাশ্মীর ভ্রমণে।

🚂 যাত্রা শুরুর আনন্দ

গত গ্রীষ্মের ছুটিতে আমরা সবাই মিলে জম্মু ও কাশ্মীর ভ্রমণের পরিকল্পনা করি। ট্রেন এবং গাড়িতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উত্তেজনাময়। যত আমরা উত্তরের দিকে এগোতে লাগলাম, ততই প্রাকৃতিক দৃশ্য পাল্টে যেতে শুরু করল। সমতল ভূমির পর চোখে পড়ল উঁচু-নিচু পাহাড় আর সবুজ বনানী।

🏔️ প্রকৃতির স্বর্গ কাশ্মীর

কাশ্মীরকে কেন "ভূস্বর্গ" বলা হয়, সেখানে পৌঁছানোর পর তা আমি বুঝতে পারলাম। চারদিকে দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বরফের চূড়া, ঝিলমিল করা সবুজ পাইন গাছ আর ফুলের বাগান—সব মিলিয়ে এক মায়াবী দৃশ্য!

ডাল লেক: শ্রীনগরের বিখ্যাত ডাল লেকে শিকারা (বিশেষ ধরনের নৌকা) ভ্রমণ ছিল সবচেয়ে মজার। শিকারা করে লেকের মধ্যে ভাসমান বাজার (ফ্লোটিং মার্কেট) দেখা এবং রাতে হাউস-বোটে (জলের উপর তৈরি কাঠের বাড়ি) থাকার অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে নতুন।

পহেলগাঁও ও গুলমার্গ: আমরা পহেলগাঁও-এর লিডার নদীর পাশ দিয়ে হেঁটেছি এবং গুলমার্গে কেবল কারে করে অনেক উপরে উঠে বরফ ছুঁয়ে দেখেছি। সেখানকার ঠাণ্ডা বাতাস আর মেঘে ঢাকা পাহাড় যেন মনকে শান্তি এনে দিচ্ছিল।

🧍 নতুন মানুষের সাথে আলাপ

ভ্রমণের সময় শুধু প্রকৃতি দেখাই হয় না, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথেও মেশা যায়। কাশ্মীরে আমি সেখানকার মানুষের সরলতা, তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও খাবার সম্পর্কে জানতে পারি। তাদের আতিথেয়তা ছিল খুবই আন্তরিক।

🧠 ভ্রমণ থেকে শিক্ষা

এই ভ্রমণ আমার কাছে কেবল একটি ছুটি ছিল না, এটি ছিল একটি শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা। কাশ্মীর ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে—আমাদের দেশ কতটা সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। পাহাড়, নদী, গাছপালা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি দেখার সুযোগ পাওয়ায় আমার জ্ঞান অনেক বেড়েছে।

ভ্রমণ আমাদের মনকে সতেজ করে, সাহস যোগায় এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ জন্মায়। আমি আশা করি, সুযোগ পেলেই তোমরাও বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এসে এমন চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post